৪শ’ বছরের ঐতিহ্য : লক্ষ্মীপুরের ঐতিহাসিক দালালবাজার জমিদার বাড়ি

0
92

মাহমুদ ফারুক:

শত শত বছর ধরে পুরোনো কারুকার্য নিয়ে এখনো কালের স্বাক্ষী হয়ে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লক্ষ্মীপুরের ঐতিহাসিক দালালবাজার জমিদার বাড়ী।
দীর্ঘদিনের অযত্ন অবহেলা আর যথাযথ সংস্কারের অভাবে এ জমিদার বাড়িটিতে ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলার ঐতিহ্য রক্ষায় বেশ কয়েকবার এ বাড়িটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে জেলা ও দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও স্থানীয় কিছু মামলাবাজ ও অসাধু ব্যক্তি বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছে। আইনী জটিলতার কারণে এটি এখন অনেকটাই লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে প্রাচীন এ ঐতিহ্য। তবে এ সকল প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে বাড়িটি অতি দ্রুত সংস্কার করে পর্যটন ও দর্শনীয় স্থান হিসেবে ঘোষনার দাবী জানিয়েছেন জেলাবাসী।
মূল কথা
বাড়িটিতে ঢুকতে হাতের ডান পাশে রয়েছে কাছারীঘর। বর্তমানে এখানে ভূমি অফিসের কার্যক্রম চলছে। মূল গেইটটি না থাকলেও কিছুদুর এগোলে চোখে পড়বে ইট সুরকি দিয়ে তৈরি বেশ কয়েকটি কামরা। হাতের ডানে রয়েছে অতিকায় পুকুর ও শান বাঁধানো ঘাটলা। ভিতরে প্রবেশ করে কিছদুর গেলেই চোখে পড়ে বিশালাকৃতির ভীম ও উপরে লোহার তৈরি থাম দিয়ে তৈরি জলসা ঘর। আর বাম পাশে রয়েছে রানীদের জন্য হল রুমের ব্যবস্থা। জলসা-ঘর লাগোয়া তিনটি বিভিন্ন আকৃতির কামরা।
জনশ্রুতি রয়েছে এ কামরাগুলোতে বসে রাজা-রানীগণ নর্তকীদের নাচ দেখতেন। আর কাজের লোকগুলো পাটাতে মশলা পিষতেন। আর এখান থেইে বিচার কার্য পরিচালনা করা হতো। সামনের কামরাগুলোতে ছিলো অতিথিদের জন্য।
সামান্য ভিতরে গেলে রয়েছে হাতের ডানে একটি স্বাতন্ত্র কামরা। আর তার পাশের ভবনের নিছেই রয়েছে কয়েকটি গুহামুখ। এ গুহাগুলো ব্যবহার করা হতো প্রতিপক্ষের হামলার ঘটনায় পালিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে।
একটু ভিতরে গেলেই সামনে পড়ে রানীর বাসস্থান। দোতলা এ ভবনের নিছে রয়েছে গুপ্ত-কুঠুরি আর উপরে রয়েছে বিশাল খোলা জায়গা।
স্থানীয় লোকজনের সাথে আলাপকালে তারা জানান, রানীর বাসভবনের নিছের গুপ্তকুঠুরিতে বসে গোপন সভায় মিলিত হতে রাজা ও তার একান্ত লোকজন।
প্রায় শ’খানেক হাত দুরে রয়েছে ৪ কামরা বিশিষ্ট আরো একটি ভবন। এখানে বিভিন্ন মালামাল রাখা হতো বলে জানান, স্থানীয়রা।
অত্যন্ত মনোরম পরিবেশ ও সুনশান নিরব একটি জায়গায় এত চমৎকার গঠনশৈলি ভবনের রূপ দেখে প্রায় ৪শ বছর পূর্বের রাজা ও জমিদারদের চিন্তা-চেতনার প্রশংসার দাবী রাখে। ভবনগুলোর চারপাশে রয়েছে নানান জাতের ফল গাছ। বর্তমানে যা ঝোঁপ জঙ্গলে ঘিরে রেখেছে।
বর্তমানে এ ভবনটিসহ স্থানীয় দালাল বাজার এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুকুরের পশ্চিম উত্তর পাশ ঘেষে রয়েছে ফাঁড়ি থানা।
আবদুস সালাম, কাদের মিয়াসহ স্থানীয় বেশ কয়েকজন বয়স্ক লোকজন জানান, ১৮৫০ এর দশকে দালাল বাজারের জমিদার রাজা গৌর কিশোর ও তার উত্তরসূরী নরেন্দ্র কিশোর রায় ৭.৮৬ একর সম্পত্তিতে জমিদার বাড়ির ভিতরে কারুকার্য খঁচিত ও মার্বেল পাথর দিয়ে বিশাল বিশাল দালান-কোঠাগুলি নির্মাণ করেন।
লক্ষ্মীনারায়ণ নামে জনৈক ব্যক্তি কাপড়ের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে দালাল বাজার আসেন। তার পুত্র ব্রজবল্লভ স্বীয় দক্ষতা গুণে ব্যবসার প্রসার ঘটান। ব্রজবল্লভের পুত্র গৌরকিশোর কলিকাতায় লেখাপড়ার সুবাদে ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানীর সাহচর্যে আসেন এবং জমিদারী খরিদ করেন। তবে কথিত রয়েছে ইষ্ট ইন্ডিয়ার কোম্পানীর সাথে তাদের ছিলো এজেন্ট ব্যবসা। আর এ কারনে স্থানীয় লোকজন তাদেরকে গোপনে দালাল বলে ডাকতো।
গৌরকিশোর ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজা উপাধী লাভ করে। গৌরকিশোর রায় ও রাণী লক্ষ্মী প্রিয়া ছিলেন নি:সন্তান। তারা ঢাকার বিক্রমপুর থেকে গোবিন্দ কিশোরকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করে। গোবিন্দ কিশোর পুত্র নলীনি কিশোর রায় চৌধুরী তাদের জমিদারীর খাজনা আদায়, তদারকী ও প্রসারে দক্ষতার পরিচয় দেয়।
বিশাল এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাড়িটিতে কারুকার্য খচিত গেইট, জমিদার প্রাসাদ, অন্দর মহল, অন্দর পুকুর, শান বাঁধানো ঘাট এ সবই পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হিন্দু জমিদার পরিবারের সদস্যগন প্রায় ২০০ একর সম্পত্তি ফেলে ভারতে চলে যায়। ১৯৬৭ সালে সরকার অর্পিত হিসাবে উক্ত ২০০ একর সম্পত্তি তালিকাভুক্ত করে।
বর্তমানে পরিত্যাক্ত জমিদার বাড়িটির রাজগেট, রাজ প্রাসাদ, জমিদার প্রাসাদ, অন্দর মহল, বাড়ীর প্রাচীর, শান বাঁধানো ঘাট, নাট মন্দির, পুজা মন্ডপ, বিরাটাকারের লোহার সিন্দুক, কয়েক টন লোহার ভীম দেখার দেখার জন্য প্রতিদিন দূর- দূরান্ত থেকে শত শত ভ্রমনপিপাসু মানুষ ছুটে আসলেও চোরের দল লুটে নিয়েছে দামী বেশ কিছু আসবাব। কিছুটা হতাশ হলেও বাড়িটির নির্মান শৈলি দেখে মন জুড়িয়ে যায় ভ্রমন পিপাসুদের । প্রতিটি ঈদ কিংবা ছুটির দিনে দেশের নানান প্রান্ত থেকে শত শত পর্যটক এখানে আসনে ঘুরতে।
১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন কার্যকরী হওয়ার পর ১৯৫৮ সালে সরকার বাহাদুর জমিদার বাড়ি কাচারী এলাকা দালাল বাজার তহসীল অফিস স্থাপন করেন।
দালাল বাজার এন.কে উচ্চ বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ঠাকুর মন্দির এ পরিবারের অবদান।
বর্তমানে বাড়ীটি সংস্কার করে পর্যটন ঘোষনা দিয়ে জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পাল বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে বাড়িটিতে বেড়ে ওঠা ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করা হয়েছে। জেলা ও জেলার বাহিরের ভ্রমন প্রিয় মানুষদের আসা যাওয়া ও নির্বিঘেœ বাড়িটির সৌন্দয্য দেখার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পাল জানান, বাড়িটিকে ঘিরে মানুষের মাঝে উৎসাহ দেখে আমি বাংলাদেশ পর্যটন করপরেশনের উধ্বর্তন কতৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি। বেশ কয়েকবার দালাল বাজার জমিদার বাড়িতে গিয়েছি, স্থানীয়দের সাথে কথা বলে বাড়িটির সংস্কার কাজে হাত দিয়েছি। এ বাড়িটি নিঃসন্দেহে এ জেলার ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সকলের সহযোগীতাও কামনা করেন তিনি। তিনি আরো জানান, ঐতিহ্যবাহী দালাল বাজার জমিদার বাড়িটি থেকে একসময় সরকারীভাবে বিপুল পরিমান রাজস্ব আয় করা সম্ভব হবে।
লক্ষ্মীপুরের দালালবাজারে যাতায়াত:
ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকা এক্সপ্রেস, রয়েল কোচ, ইকোনো সার্ভিস (এসি, নন-এসি) গাড়ীতে করে মাত্র সাড়ে ৪ঘন্টার পথ লক্ষ্মীপুর। পথিমধ্যে কুমিল্লার কোন হাইওয়ে রেস্তোরায় সকালের নাস্তার জন্য যাত্রা-বিরতি। সকাল ৬টায় সায়দাবাদ থেকে রওয়ানা হয়ে লক্ষ্মীপুর শহরে না নেমে গাড়ীর সুপারভাইজারকে দালালবাজার বাস টার্মিনালে নামিয়ে দেয়ার কথা বললেই হবে। দালাল বাজার নেমে যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দিবে দালাল বাজার জমিদার বাড়ীটি। বাস টার্মিনাল থেকে হাঁটা পথে মাত্র দুই মিনিটের রাস্তা। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দালালবাজার পুলিশ ফাঁড়িতো রয়েছেই।
দালাল বাজার জমিদার বাড়িটি দেখার জন্য দুই ঘন্টাই যথেষ্ট। হাতে সময় থাকলে চলে যেতে পারেন কামান খোলা জমিদার বাড়ী। দালালবাজার জমিদার বাড়ী দেখে বের হয়ে বাজারের যে কাউকে বললেই দেখিয়ে দিবে কামানখোলা জমিদার বাড়ীর রাস্তা। এখানে গেলে জানতে পারবেন, “লক্ষ্মীপুর” নামকরনের আধ্যপান্ত। (কামানখোলা জমিদার বাড়ী নিয়ে জানবেন অন্য কোন সংখ্যায়)
দুপুরের খাবারের জন্য দালালবাজারে কয়েকটি হোটেল। সেখানে খেতে না চাইলে দালালবাজার থেকে আনন্দ পরিবহন বা সিএনজিতে করে সোজা লক্ষ্মীপুর আসলেই রয়েছে আধুনিক মানের খাবার হোটেল। লক্ষ্মীপুর চৌরাস্তার আশে পাশেই রয়েছে ক্যাফে কুইন, রাঁধুনি, মোহাম্মদিয়া, নুরজাহান ও মদিনা হোটেল। এছাড়া বিভিন্ন চাইনীজ রেস্তোরাও রয়েছেই।
যাদের হাতে অপুরন্ত সময় রয়েছে বা একদিন থাকতে চান তাহলে আগে থেকে লক্ষ্মীপুর সার্কিট হাউজ বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন। বিশালাকৃতির সার্কিট হাউজ সংলগ্ন এলাকাটি ফুলের বাগানসহ বিভিন্ন গাছপালার সমারোহ। সেখানে থাকতে না চাইলে চলে যেতে পারেন, শহরের ভিতরে। সেখানে রয়েছে আধুনিকমানের সোনারবাংলা, মুক্তিযোদ্ধা গেষ্ট হাউজ বা সেন্টমার্টিন রেষ্ট হাউজ।
যদি দুই দিন থাকার বাসনা নিয়ে লক্ষ্মীপুরে আসেন, তাদের জন্য সময়টি খুব আনন্দমুখরতায় কাটবে বলে বিশ্বাস করি। যারা নদীর ইলিশ খেতে চান, তারা পরদিন যেতে পারেন রামগতির মেঘনার চর-আলেকজান্ডার বা মতিরহাঁট। আলেকজান্ডারে রয়েছে মেঘনা নদী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রামগতির আলেকজান্ডার বাজার ও কমলনগরের হাজিরহাট ও মতিরহাট রক্ষায় নির্মান করছেন বেড়িবাঁধ। মেঘনার ভাজা ইলিশ অন্যদিকে মেঘনা নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে দেখবেন বরিশালের অংশ বিশেষ। (“রামগতির আলেকজান্ডার ও মেঘনার ইলিশ” সে গল্প অন্য একদিন)
পরদিন সকাল ৬টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে অফিসের কাজকর্মে মনযোগ দিতে পারবেন অনায়াশেই।