মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরনে আমাদের অর্জন, প্রতিবন্ধকতা এবং করনীয়

0
667

শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ। এই স্লোগান সামনে নিয়ে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা এগিয়ে যাচ্ছে দূর্বার গতিতে।
আমরা জানি যে, প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে সকল ধরনের শিক্ষার ভিত্তি স্বরুপ। যে কোন অবকাঠামোর ভিত্তি যদি মজুবত না হয় তাহলে সেটা ঝুকিপূর্ন বলে আমরা ধরে নেই। তদ্রুপ প্রাথমিক শিক্ষা যদি মানসম্মত না হয় তথাপি পরবর্তী শিক্ষাস্তর টেকসই হওয়ার কথা নয়। প্রাথমিক শিক্ষার স্তর বলতে ১ম শ্রেনি হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত বুঝায়।
যদিও জাতীয় শিক্ষানীতি -২০১০ এ উল্লেখ রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষাস্তর ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত এবং সে মোতাবেক বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
এ ছাড়াও প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি নামে বাংলাদেশের প্রত্যেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি বিশেষ শ্রেণি রয়েছে।
এ শ্রেণিটি হচ্ছে ১ম শ্রেণিতে ভর্তিও প্রস্তুতি স্বরুপ। বিদ্যালয়ের সবচেয়ে আকর্ষনীয় কক্ষটি হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির জন্য বরাদ্দ। ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা রয়েছে।
এ যোগ্যতাগুলি প্রত্যেকটি শ্রেণিতে বিষয় ভিত্তিক ভাগ করা রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী ১ম শ্রেণি হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষ কওে যদি ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা সফলভাবে অর্জনের মধ্য দিয়ে বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পাওে তাহলে আমরা ধরে নিব সে শিক্ষার্থীর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন হয়েছে।
ইতমধ্যে বর্তমান সরকার বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কিছু অভূতপূর্ব এবং যুগোপযোগী পরিবর্তন সাধন করেছে।
উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-
১. সকল শিক্ষার্থীর হাতে ১ জানুয়ারীতে সম্পুর্ন বিনামূল্যে পাঠ্য বই দিয়ে আসছে সরকার। আমি যতদূর জানি পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এভাবে সম্পুর্ন বিনামুল্যে পাঠ্য বই বিতরন করা হয় না।
২. শতভাগ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির আওতায় নেওয়া হয়েছে এবং শিউরক্যাশ এর মাধ্যমে উপবৃত্তির অর্থ সরাসরি অভিভাবকদের মোবাইলে পৌঁছে যায়।
৩. ১৯৭৩ সালে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একসাথে ৩৬১৬৫টি বিদ্যালয় জাতীয় করণের পর বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা অবশিষ্ট ২৬১৯২টি বিদ্যালয় ২০১৩ সালে জাতীয়করণ কওে নিয়েছেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সাহসী ও যুগান্তকারী প্রদক্ষেপ।
৪. বাংলাদেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু করা হয়েছে এবং এ শ্রেণির জন্য প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একটি করে কক্ষ নির্মানের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পাশাপাশি এ শ্রেণির জন্য প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
৫. ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছর হতে আগামী ৫ বছরের জন্য ৪র্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP-4) নামে একটি প্রকল্প মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষওে একনেকে অনুমোদন হয়েছে। এ প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা।
৬. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকগনকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নিতকরনসহ সহকারি শিক্ষকগনের বেতেন গ্রেড উন্নিত করা হয়েছে।
৭. প্রত্যেক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মানসহ স্লিপ, প্রাক-প্রাথমিক, রুটিন মেনটেইনেন্স, ওয়াসব্লক মেরামত, ক্ষুদ্র মেরামত, বৃহৎ মেরামতসহ বিভিন্ন ধরনের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে প্রতিবছর।
৮. বিদ্যালয়গুলোতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, সাউন্ডসিস্টেম, পিএনও ইত্যাদি দেওয়া হয়েছে।
৯. শিক্ষক এবং কর্মকর্তাগনের বিভিন্ন ধরনের আধুনিক প্রশিক্ষন দেওয়া হচ্ছে দেশে এবং বিদেশে।
১০. প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একজন করে দপ্তরি কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও উল্লেখ করার মত আরও অনেক অর্জন রয়েছে আমাদের ।

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার (ঝউএ) ১৭টি লক্ষের মধ্যে ৪ নম্বর লক্ষ্যটি হচ্ছে গুনগত শিক্ষা নিয়ে। এর মধ্যে আমরা যেহেতু কাজ করি প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে তাই আমি গুনগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরনের জন্য কিছু দিকনির্দেনামূলক কথা বলতে চাই।
২০৩০ সালের মধ্যে গুনগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরনে যে লক্ষ্য মাত্রা রয়েছে সেখানে আমাদের কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। এ সকল প্রতিবন্ধকতা এবং তা থেকে উত্তরনের উপায় নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. দীর্ঘ দিন যাবৎ মামলাজনিত জটিলতার কারনে শিক্ষক নিয়োগ স্থগিত ছিল। যদিও এখন মামলা নিস্পত্তির কারনে ২০১৮ সাল হতে শিক্ষক নিয়োগ নিয়মিত হচ্ছে। এ ছাড়াও শিক্ষকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের মামলা রয়েছে। এ সকল মামলার নিম্পত্তির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যদি একটু আন্তরিকতার সাথে দ্রুত নিম্পত্তির ব্যবস্থা করেন তাহলে আমাদের শিক্ষকদের বিদ্যালয়ের প্রতি আরো বেশী আন্তরিকতা লক্ষ্য করা যাবে।
২. একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন ৬/৭টি ক্লাশ নেন তাহলে সেই ক্লাশের গুনগতমান ততোটা মানসম্মত হয় না। তাই আমি মনে করি একজন শিক্ষক ৪টি কওে ক্লাশ নিবেন প্রতিদিন। তাহলেই তিনি লেসন প্লান অনুসরন করে, বাস্তব উপকরন ব্যবহার করে এবং মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে মানসম্মত ক্লাশ নিতে পারবেন।
৩. বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায় একজন শিক্ষক বাংলা, গণিত, ইংরেজিসহ সকল বিষয়ের ক্লাশ নিয়ে থাকেন। যদি একজন শিক্ষক সকল শ্রেণির ১টি বিষয়ের ক্লাশ নেন তাহলে সেই ক্লাশের গুনগতমান ঠিক থাকবে। তাই বিষয়-ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করছি।
৪. ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা প্রত্যেক শ্রেণিতে এবং প্রত্যেক বিষয়ে ভাগ করা আছে। ১টি শ্রেণি হতে অন্য শ্রেণিতে উত্তীর্ণের ক্ষেত্রে অবশ্যই এই সকল যোগ্যতা অর্জন হয়েছে কিনা তার উপর জোর দিতে হবে। যদি কেউ ১টি শ্রেণিতে নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে তাহলে তাকে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা যাবেনা।
৫. বিদ্যালয়ের সময়-সূচির মধ্যেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। একজন শিক্ষক সকাল ৯ ঘটিকা হতে বিকাল ৪.৩০ ঘটিকা পর্যন্ত টানা ক্লাশ নিলে ক্লাশের গুনগতমান ততোটা ভালো হবেনা।
৬. ইহা ছাড়াও শিক্ষার্থীরা একটু চঞ্চল হওয়ায় এত সময়ে বিদ্যালয়ে তাদেরকে ধরে রাখা কষ্টসাধ্য। আমাদেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬০% মহিলা শিক্ষক। তারা তাদের পরিবারের সকল কর্ম গুছিয়ে সকাল ৯টায় বিদ্যালয় উপস্থিত হওয়া দূরহ ব্যাপার। যদিও নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন তথাপি তাদের মানষিক প্রশান্তির ঘাটতি রয়ে যায়। তাই আমার পরামর্শ বিদ্যালয়ের সময়সকাল ১০ ঘটিকা হতে বিকাল ৩.৩০ ঘটিকা পর্যন্ত যথেষ্ট।
৭. শিক্ষকগণের পাশাপাশি বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি (এসএমসি) ও পিটিএ কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষনের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। কারন তারা বিদ্যালয়ের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে আসছে।
৮. শিক্ষকগণকে দিয়ে জাতীয় বিভিন্ন ধরনরে কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করানো হয়। এ সময়ে বিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। এটি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়।
৯. শিক্ষকগণের পদন্নোতির ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। একজন শিক্ষক মনে করেন তিনি যে পদে যোগদান করেছেন সেই পদেই অবসরে যাবেন তাহলে তার মধ্যে কাজের প্রতি আগ্রহ এবং আন্তরিকতা কমে যায়। শিক্ষকণনকে যদি তার পুরো চাকুরীজীবনে কমপক্ষে ২টি পদন্নোতির ব্যবস্থা করা যায় তাহলে কাজের প্রতি তারা আরো বেশী আন্তরিক হবেন বলে আমার বিশ্বাস।
১০. প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কাজের পরিধি আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। বিভিন্ন ধরনের তথ্যের কাজে প্রধান শিক্ষকগণকে বেশীর ভাগ সময় বিদ্যালয়ের বাহিরে গিয়ে কাজ করতে হয়। এ ছাড়াও অনেক ধরনের রেজিষ্ট্রার হালফিল রাখতে হয়। এ সকল দাপ্তরিক কাজের কারনে প্রধান শিক্ষকগণ শ্রেণি কার্যক্রমে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একজন করে অফিস সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।

এগুলো ছাড়াও ছোটবড় অনেক প্রতিবদ্ধকতা রয়েছে। আমরা সবগুলে একত্রে সমাধান করতে পারবোনা। কারন সেই ধরনের সক্ষমতা আমাদের নেই। তারপরেও ধাপে ধাপে আমরা এই ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারি তাহলে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (MDG) এর মত করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা (SDG) তেও ২০৩০ সালের পূর্বেই নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করে দক্ষিন এশিয়ায় অনুকরনীয় হয়ে থাকতে পারব।
মোঃ শাহাদাত হোসেন
সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার
চাটখিল, নোয়াখালী।