মুরসির মৃত্যুর দায় মিসর সরকারের

0
56

মিসরের রাজধানী কায়রোর একটি আদালতে গত ১৭ জুন মামলার বিচার চলাকালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অচেতন হয়ে মারা যান দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। তিনি ছিলেন মিসরের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।

তার মৃত্যুকে দেশটির সেনা সমর্থিত সরকার স্বাভাবিক বললেও বিশ্ব নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই তা মানতে নারাজ। তারা মুরসির মৃত্যুর জন্য সে দেশের ‘অভ্যুত্থানকারী’ সরকারকে দায়ী করেছেন।
মুরসির মৃত্যুর ঘটনায় জাতিসঙ্ঘের তদন্ত দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা এ ঘটনায় নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছে। এ দিকে মোহাম্মদ মুরসিকে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে কঠোর গোপনীয়তায় রাজধানী কায়রোতে দাফন করা হয়েছে। মুরসির পরিবারের পক্ষ থেকে সারকিয়া প্রদেশের নিজ শহরে তাকে দাফনের আবেদন জানানো হলেও তা নাকচ করে দেয় সরকার। খবর আলজাজিরা, এপি, রয়টার্স ও বিবিসির।
২০১৩ সালে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুরসিকে কারাবন্দী করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে দেয়া হয় হত্যাসহ বিভিন্ন মামলা। গত ১৭ জুন সোমবার কায়রোর একটি আদালতে মামলার শুনানিকালে এজলাসে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মোহাম্মদ মুরসি। মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, ‘আদালতের এজলাসে হঠাৎ পড়ে গিয়ে’ তার মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ মে তিনি আদালতে বলেছিলেন, তার জীবন হুমকির মুখে।

সোমবার আদালতে মুরসি মারা যাওয়ার পর অনেকক্ষণ মৃত্যুর বিষয়টি গোপন রাখে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ আল সিসির প্রশাসন। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আদালতের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর মুরসি অচেতন হয়ে পড়েন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
অন্যদিকে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, আদালতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি পাচার মামলার শুনানি চলছিল। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারকের কাছে কথা বলার অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেয়া হয়। এ সময় ২০ মিনিট বক্তব্য রাখেন তিনি। বক্তব্যের মধ্যেই বুকে ব্যথা অনুভব করেন মুরসি। এক পর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। এ সময় দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুরসি।

কঠোর গোপনীয়তায় দাফন : গতকাল মঙ্গলবার কায়রোর নসর এলাকায় কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে দাফন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। মুরসির পরিবারের সদস্যদের এতে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেয়া হয়। টোরা কারা-হাসপাতালে বাবাকে গোসল করিয়ে দেন ছেলে আহমেদ মুরসি। এরপর কারা-হাসপাতালেই নামাজে জানাজা শেষে কায়রোতে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাবেক নেতাদের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

সোস্যাল মিডিয়ায় ফাঁস হওয়া খবরে বলা হচ্ছে, মুরসির ভাই, স্ত্রী, ছেলে এবং দুইজন আইনজীবী তার নামাজে জানাজায় শরিক হন। মঙ্গলবার নিজের ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছেন মুরসির ছেলে আহমেদ মুরসি। তিনি বলেন, হাসপাতালে আমরা তাকে গোসল করিয়েছি। তার জানাজা নামাজ আদায় করেছি এবং তাকে দাফন করা হয়েছে।

মুরসির মৃত্যুর দায় মিসর সরকারের : আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) মুরসির মৃত্যুর জন্য সে দেশের ‘অভ্যুত্থানকারী’ সরকারকে দায়ী করেছে। মিসরের বর্তমান সরকার কারাগারে সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসির চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। সংগঠনটি মুরসির মৃত্যুতে শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বলেছে, বিশ্ববাসী মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহাম্মাদ মুরসিকে মনে রাখবে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, কারাবন্দী থাকার সময়ে মুরসিকে একবারও তার আইনজীবী বা চিকিৎসকের সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি। মাত্র তিনবার তিনি স্বজনদের সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

মুরসির মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছে তার সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিন। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ মুরসিকে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার এবং পরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর পর মুরসির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে এবং এরই ধারাবাহিকতায় তার মৃত্যু হলো। মোহাম্মদ মুরসি ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। মুরসি কারাগারে মারা যেতে পারেন বলে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থা আগে থেকেই সতর্ক করেছিল।