চাকচিক্যময় রামগঞ্জ খুব প্রয়োজন কি?

0
592
মোহাম্মদীয়া হোটেল এন্ড চাইনীজ রেস্তোরার ভিতরের অংশ

আহম্মদ ফয়েজ

লেখক: আহম্মদ ফয়েজ

এই লেখাটি যদি এমন হতো যে এটি পড়লে আপনি জীবনে কিভাবে সহজে সাফল্য পেয়ে যাবেন তার একটি প্রেসক্রিশন।
তাহলে আমি এইলেখা যেভাবেই শুরু করতাম না কেন পাঠক হিসেবে আপনি তা শেষ পর্যন্ত পড়তেনই। কারণ সহজ সাফল্য মানুষের খুব কাক্ষিত জিনিস। যদিও সাফল্য কখনো সহজ বিষয় নয়। আর আমর এই লেখাও সাফল্য ব্যার্থতা কাটিয়ে উঠার কোন পদ্ধতি বাতলে দেবেনা।
উল্টো আমি লিখতে যাচ্ছি অজনপ্রিয় একটি বিষয় নিয়ে, চাকচিক্য বিরোধী লেখা। মানুষ চাকচিক্য ভালবাসে, এর বিরোধীতা পছন্দ করে না। মানুষ মূলত তার সময়কে উপভোগ করতে চায় সেটা যে কোন উপায়েই হোক। এই বাস্তবতা বৈশ্বিক, আঞ্চলিক এবং একান্তই আমার আপনার গৃহস্থলিতেও বিদ্যমান। আমার এই প্রবন্ধে আমি খুব সামান্য (!) একটি বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি (!) রকমের বিতর্ক করবো, যা বেশীর ভাগ পাঠকের কাছেই অবান্তর মনে হতে পারে। এই লেখার পাঠকের গণ্ডিও খুব সীমিত পরিসরের।
লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জের নাগরিকদের জন্য, আরো সুর্নিদিষ্ট করে বললে এই এলাকার অগ্রসরমান মানুষদের জন্য আমার এই লেখা।

কেন এই লেখাটি লিখছি? কিভাবে মনে হলে এই লেখাটি লেখার প্রয়োজন আছে? তার একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। গত ১১ একজন গণমাধ্যমকর্মী তার ফেসবুকে একটি তথ্য শেয়ার করেছেন।
সেই তথ্যটি হচ্ছে- “লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে সোনাপুরস্থ ওয়াপদা সড়কের উইন টাওয়ারে এসি বাজার ইলেকট্রনিক্স সেন্টারের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে।”

রামগঞ্জ শহরের বাইপাস সড়কে অত্যাধুনিকমানের মোহাম্মদিয়া হোটেল এন্ড চাইনীজ রেস্তোরা। সম্প্রতি উপজেলায় এ রেস্তোরাটি চালু হওয়ার পর ব্যপক সুনাম কুড়িয়েছে।

এই তথ্যের এক জায়গায় দেখা যায়, “প্রতিষ্ঠটানের পরিচালক মো: কবির হোসেন জানান, দিন-দিন দেশ উন্নতির পাশাপাশি রামগঞ্জেও ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। এতে জনমানুষে রুচির পরিবর্তন হচ্ছে। সবদিক বিবেচনা করেই সকল প্রকার ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর সমন্বয়ে তিনি এসি বাজারইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠানটি দিয়েছেন।”

আধূনিক মানের ক্যাপসিকাম হোটেল এন্ড চাইনীজ রেস্তোরা

এই তথ্যটি, বিশেষত “এতে জনমানুষের রুচির পরিবর্তন হচ্ছে” অংশটুকু আমাকে ভিষণভাবে আলোড়িত করেছে। এই পোস্টটি দেখার মাত্র কয়েকদিন আগেই আমি রামগঞ্জ থেকে ঘুরে এসেছি। অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় সেখানে চাকচিক্য বা আলোর ঝলকানি ছিলো অনেক বেশী। পরিস্কার বুঝতে পেরেছি রামগঞ্জ এগিয়ে গেছে । অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সেখানে ডজনখানেক বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিক গড়ে উঠেছে।
সবচে বেশী আলোচনা তৈরি হতে বা মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকতে দেখেছি ব্যয়বহুল বহুতল রেস্টুরেন্টগুলো নিয়ে। সেখানেউপচে পড়া ভিড়। ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলাদেশের বহু জেলা শহর, উপজেলা শহর ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়েছি। সেগুলোর অধিকাংশই রামগঞ্জের কাছে ফেল।
এটা নিশ্চয়ই আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ! কিন্তু মুশকিলটা অন্য জায়গায় দেশের অপরাপর এলাকায় শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির বিকাশে মানুষের যে প্রাণন্তকর চেষ্টা তার পুরোটাই এখানে অনুপস্থিত। হুট করে শহরে চোখ-ধাঁধানো রঙিন আলোর ঝলকানি আর মুখে মুখে ব্যয়বহুল রেস্টুরেন্টের গল্পের পাশাপাশি একটিও নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা বা কোন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড গড়া রেজাল্টের গল্প।

এখানেতো কোন কবিতার আড্ডা বা গানের আসর বসে বলে কখনো শুনিনি। রামগঞ্জে কোনো কবি অথবা শিল্পী নেই কি তবে! এটা কি করে সম্ভব? একটা জনপদ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে কি করে!

আমি যে স্কুল থেকে পড়াশোনা করেছি সেই স্কুল থেকে এ বছর এসএসসি পাস করা সব শিক্ষার্থীকে ঈদুল ফিতরের পরদিন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমরা একটি করে বই উপহার দিয়েছি। এই উপহার তাদেরকে যেভাবে আনন্দিত বা আলোড়িত করবে ভেবেছি, তা করেছে বলে আমার মনে হয়নি। তবে কি নতুন বইয়ের প্রতি, সিলেবাসের বাইরের বইয়ের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা! তাই কি হবার কথা?

সরকারের পরিসংখ্যান বলছে, রামগঞ্জে বর্তমানে (২০১৯) মাধ্যমিকে ৩১টা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সর্বমোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪ হাজার ২৭৩ জন।
এর মধ্যে নারী বালিকা ৮ হাজার ৫৭৬ এবং বালক ৫ হাজার ৬৯৭জন। তবে ২০১৮ সালে এই উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলো ৩২টি। তার মানে রেস্টুরেন্ট আর লাক্সারি ক্লিনিক বাড়লেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিন্তু বাড়ছে না। ২০১৮ সালে উপজেলার মোট মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ছিলো ১৯ হাজার ৬১৭জন । যার ১১ হাজার ৫৮৭জন ছিলেন বালিকা আর ৮ হাজার ৩০ জন ছিলেন বালক। এই সমীকরণেও আমরা পিছিয়েছি তাতো বুঝতেই পারছেন।

এসবের বাহিরেও যদি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণে যাই তবে তো মন আরো খারাপ হবার উপক্রম হবে। সেসব আর না করি।

আচ্ছা এই যে আমাদের এতো এতো শিশু কিশোর উপজেলার ১২৬ টি গ্রামে বেড়ে উঠছে এদের কেউ কি গান শেখে? আর্ট স্কুলে যায়? এতো এতো আধুনিক রেস্তোরা গড়ে উঠতে পারে একটা গানের/ আর্টের স্কুল হতে পারে না? এসবের কোনই কি প্রয়োজন নেই?

মুশকিল হচ্ছে আমাদের অঞ্চলে এখনো মানুষ মানুষকে মূল্যায়ন করার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে ব্যাক্তির আর্থিক অবস্থান।

এই যে শিক্ষাকে স্বল্পগুরুত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে একটা জনপদ গড়ে উঠছে এর নেপথ্য কারণ কি? এখানে এখনো অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বিত্তবান ব্যক্তিই কেন বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
ভাবতে হবে ভবিষ্যতের জন্য।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ahammadfoyez@gmail.com
www.facebook.com/ahammad.foyez