এসো শালিক পাখির মেলায়

0
365

সাঈফ ফাতেউর রহমান : তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছো, যে শালিক চেনো না? আসলে শালিক কিন্তু এদেশের সবচে পরিচিত পাখিদের একটি। আছেও এরা সারাটা দেশ জুড়ে। আর সংখ্যাতেও এরা প্রচুর। বন, ঝোপ-ঝাড়-শহর-বন্দর সবখানেই এদের দেখতে পাবে। লোকালয়ে আর জনবসতির কাছাকাছিই থাকে এরা বেশি। সম্ভবত মানুষের সাহচার্য বেশ পছন্দ করে।
পাখি বিজ্ঞানীরা বেশ ক’ধরনের শালিকের খোঁজ পেয়েছেন এদেশে। এর মধ্যে কয়েকটির কথা বলবো। কাঠশালিক- আর গোবরে শালিকই শালিকদের মধ্যে বেশি পরিচিত। কাঠশালিকদের রং বাদামী আর রূপালীর আভাযুক্ত ধূসর। পেটের নিচের দিকটা বাদামী। এদের চোখ সাদা থেকে হালকা নীলাভ রঙের। ঠোঁটের গোড়া এদের কালচে নীল আর আগার দিক উজ্জ্বল হলুদ। কাঠশালিকের লেজের বাইরের পালক লালচে বাদামী রঙের। বাসা বানায় এরা বর্ষাকালে। খুঁজে নেয় গাছের কা-ের কোন গর্ত বা ফাঁক-ফোঁকর। আর শহরে কোন বাসাবাড়ির ভেন্টিলেটার। তেমন যতেœ বানায় না বাসা। ঘাস, খড়, লতাপাতা আর নানা ধরনের টুকরো-টাকরা জিনিসপত্র দিয়ে। বাসাতে নীলাভ রঙের ডিম পাড়ে এরা ৩-৫টি। জোড়া বেঁধে বা সদলবলে চলে এরা। বট, পাকুড়, অশ্বন্ন, ডুমুরের নরম ফল খায়। আর পছন্দ করে শিমুল, পলাশ ও অন্যান্য ফুল থেকে মধু চুষে খেতে। গাছের আর ফলের পোকামাকড়, এদের ডিম, শুককীট, শুককীট খুঁটে খুঁটে খায় এরা। ঢাকা শহরেও কাঠশালিকের সংখ্যা এখনও প্রচুর।
গোবরে শালিককে অনেকে গুয়ে শালিক বা গুশালিকও বলে থাকেন। এদেরও অভ্যেস লোকালয়ের কাছাকাছি থাকা। ঢাকাতেও এরা প্রচুর সংখ্যায় আছে এখনও। তবে বনে, ঝোপে-ঝাড়েও থাকে এরা। আদায়-কালোয় মেশানো এদের গায়ের রং। মাথা, ঘাড়, থুতনী, গলা, বুক আর লেজের রং কালো। আর কপাল, মাথার পাশ, পেট আর পেছনের দিকটা সাদা। ঠোঁটের রং হলুদ। এদের চোখের পাশ দিয়ে আছে হালকা কমলা রঙের চামড়া। পা এদের হলুদাভ। বাসা বাঁধে এরা বর্ষাকালে। বাসা বানাতে বেছে নেয় মাদার, আম, কদম- এ ধরনের গাছ। গাছের ৫-১০ মিটার উঁচুতে খড়, ঘাস, রশি, কাঠ আর টুকরো-টাকরা নানা জিনিসপত্র দিয়েই এরা বড় আকারের গোল বাসা বানায়। বড়ই অগোছালো এদের বাসা। কখনও কখনও দেখা যায়, টেলিগ্রাফের খুঁটির ওপরেও বাসা বানিয়েছে এরা। বাসায় নীল রঙের ৪-৫টি ডিম পাড়ে। বাসা বানানো, ছানার যতœ সব কাজ করে মেয়ে-পুরুষ মিলে। গোবরে শালিক ঘোরে ফেরে জোড়ায় জোড়ায়। তবে যখন খাবার খুঁজতে যায় এখানে সেখানে, মাঠে-ঘাটে, সাধারণত দল বেঁধে যায়। কখনও কখনও দলে থাকে শালিক ছাড়া অন্য পাখিও। খাবার কুড়ায় ডাস্টবিনের আবর্জনা থেকে, রান্নাঘরের পেছন থেকেও ফেলে দেয়া খাদ্যকণা কুড়িয়ে খায়। পোকামাকড়, মাকড়সা, ফড়িংও খায় পছন্দ করেই।
বামন শালিক নামে আরও এক ধরনের শালিক হঠাৎ করে দু-একটা দেখা যায়। এদের মাথার রং কালো, কালো চূড়ার পালক ছড়িয়ে থাকে ঘাড় পর্যন্ত। ভিনদেশী এক শালিক কখনও কখনও আসে আমাদের দেশে। এদেরকে বলা হয় ভিনদেশী শালিক। কুচকুচে কালো এদের গায়ের রং। এর ওপর থাকে সবুজ আর নীলের আভা। এদের ঠোঁট চিকন, হলুদ, পা লালচে বাদামী আর চোখ বাদামী। এরা বিরল প্রজাতির শীতের পাখি।
শালিক নিয়ে কথা বলতে গেলে গাঙ শালিকের কথা তো এসেই যায়। নদীর পাড়ে আর বড় বড় সেতুর নিচে দলে দলে দেখতে পাবেন এদের। নদীর খাড়া পাড়ে গর্ত করে এরা আর সেখানেই বাসা বাঁধে। অবশ্য কখনও কখনও সেতুর কোন ফাঁক-ফোকর পেলে গাঙ শালিক সেখানেও বাসা বাঁধে। খুব কম ক্ষেত্রেই গাছে বাসা বাঁধে এরা। খুব প্রয়োজন পড়লে আম, জাম, কাঁঠাল- এধরনের কোন গাছ বেছে নেয়, তবে তা অবশ্যই নদী থেকে খুব দূরে নয়। মানুষের বাড়িঘর, ছাদ, কার্নিশ বা ভেন্টিলেটার বা কড়িবরগার ফাঁকে কখনই বাসা বানায় না এরা। বাসা বানাতে ব্যবহার করে অতি সাধারণ উপকরণ ঘাস-পাতা, আবর্জনা, লতাপাতা, কাঠিকুঠি। দেশের সব জায়গাতেই কম-বেশি এরা আছে। তবে বনে থাকতে পছন্দ করে না। জনবসতির কাছাকাছি গ্রাম, বন্দর, শহরেই এরা বেশি স্বচ্ছন্দ্য। বাসাতে উজ্জ্বল নীল ৪-৫টি ডিম পাড়ে এরা। বাচ্চা ফুটলে মা-বাবা দুজনেই যতœ করে, খাবার খাওয়ায়।
গায়ের রং এদের সাদায় কালোয় মেশানো। পাতলা ছিপছিপে গড়ন এদের। গাঙ শালিকের চোখের চারপাশে কমলা বা লালচে রঙের গোল, মুক্ত চামড়া থাকে। ঠোঁট এদের কমলা-হলুদ। পায়ের রং হলুদ, তবে সেখানে পালক নেই কোন।
ঝাঁকে ঝাঁকে এরা ঘোরে ফেরে। অবশ্য কখনও কখনও জোড়া বেঁধেও বের হয় এরা। সাধারণ শালিক, সব ধরনের খাবার খেলেও গাঙ শালিকের কিছু বাছবিচার আছে। নানান ধরনের গাছের ফল খায় এরা, খায় ছোট ছোট পোকামাকড় আর ফসলের দানা। গাঁয়ের গবাদিপশুর শরীরের পোকা খুঁটে খুঁটেও এরা খায়। তাই গবাদিপশুর চরে বেড়ানোর জায়গাতে এদের আনাগোনা বেশি। আবর্জনা খুঁটেও খাবার খায় এরা। আর খায় মানুষের ফেলে দেয়া খাদ্যের উচ্ছিষ্ট।
গলার স্বর বেশ মিষ্টি আর সুরেলা। যখন ডাকে গাঙ শালিক, কেমন গানের সুরের মত মনে হয়।
গাঙ শালিকের মতই প্রায় একই স্বভাব, আচরণ, চেহারা আর খুব বেশি দেখা যায় না এমন দুটি শালিক হলো-ভাত শালিক আর ঝুঁটি শালিক। বলা হয়ে থাকে এসব শালিকের কিচির মিচির ডাকেই সকাল হয় বাংলাদেশে, সন্ধ্যে নামে। ভাত শালিকের গায়ের রং সাধারণভাবে বাদামী। এদের মাথা, গলা, বুক কালো, ডানার পাশ, আগা আর লেজও কালো। পেট আর লেজের নিচের দিকের রং ধবধবে সাদা। এদের ঠোঁট হলুদ, চোখের পাশে থাকে মুক্ত চামড়া। একই ধরনের স্বভাব, আচরণ ঝুঁটি শালিকেরও। ঝুঁটি শালিকের শরীরের রং কালচে বাদামী। ঠোঁটের গোড়ায় থাকে স্পষ্ট ঝুঁটির মত। এদের ঠোঁট হলুদ, তবে গোড়াটা গাঢ় নীল। চোখের রং হলুদ। পা এদের কমলা বা হলুদ রঙের। ঝুঁটি শালিক আর ভাত শালিক বাসা বানায় বর্ষা মওসুমে। এরা কিন্তু নদীর পাড় খুঁড়ে বাসা বানায় না। গাছের গুড়ির গর্ত, ফাঁক-ফোকর বা দালান-কোঠার কড়িবরগা, ভেন্টিলেটর- এসব জায়গাতেই বাসা বানায়। ঘাস, ছেঁড়া পলিথিনের টুকরো, সবুজ পাতা, ছোট-খাট কাঠ, ছেঁড়া ন্যাকড়া এমনকি সাপের খোলস দিয়েও। গ্রামে অনেকে এদের বাসা বানানোর জন্যে গাছের ডালে পুরাতন মাটির কলসি বেঁধে দেন। এরা বাসা বাঁধে সেখানে। ঝুঁটি শালিক ৩-৪টি, ভাত শালিক ৪-৫ নীল রঙের ডিম পাড়ে। সব কাজ করে মেয়ে-পুরুষ মিলেমিশে।
ছবি: মাহমুদ ফারুক
সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম